কোথাও শৃঙ্খলা নেই, কোথাও জবাবদিহিতা নেই। এক উদ্ভট গাধার পিঠে চড়ে নিশ্চিন্তে চলছে প্রিয় জন্ম ভূমি বাংলাদেশ। দেখতে দেখতে বাংলাদেশের বয়সও কম হলো না, কিন্তু হাজারো সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশটি নানাভাবে দুর্বল হয়ে, খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে আমার মূল দাবি : ‘অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা।’ অন্যান্য দাবির কথা নাইবা বললাম। তবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা সম্পর্কে সামান্য কিছু বলা দরকার।
খুলনা বাংলাদেশের নানা অঞ্চলের মানুষের শংকর সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে। পাহাড় জনপদ থেকে শুরু করে বঙ্গোপসাগরের পাড় পর্যন্ত সকল এলাকার মানুষ এই খুলনায় বসবাস করে। ভাগ্য অন্বেষণে এখানে আসা বাংলাদেশের নানা অঞ্চলের মানুষ প্রতিনিয়ত জীবন জীবিকার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। কতিপয় চাকুরিজীবী ব্যতীত প্রায় অধিকাংশ কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভরশীল। এই শ্রমজীবী মানুষেরা দু’মুঠো গ্রাসাচ্ছাদনের জন্য প্রতিনিয়ত ব্যতিব্যস্ত। তাদের দৈনন্দিন জীবন সংগ্রাম, দারুণ উত্তাপ উত্তেজনায় ভরা।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামোয় অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষার পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যব্যবস্থা উন্নয়ন জরুরি বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। কিন্তু গ্রাম প্রধান বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে কোনো উক্তি করতে গেলে দুর্নীতি, অনিয়ম, অব্যবস্থা, স্বেচ্ছাচারিতা ও উদাসীনতার এক ক্লান্তিকর ছবি চোখে ভেসে ওঠে।
বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে ভাবলে মনে হয়, মাটি যদি ফেটে যেত, সেই গভীর ফাটলে হঠাৎ করে হারিয়ে যেতাম। রসিকজনেরা মজা করে বলেছেন, ‘ধরণি দ্বিধা হও মাটির তলে লুকাই!’
বিড়ম্বনার অপর নাম যদি হাসপাতাল হয়, তাহলে মানুষ অসুস্থ হলে, যাবে কোথায়? দেশের গ্রাম শহর কিংবা মহানগর অথবা মেগাসিটিতে; এমনকি রাজধানীর অনেক হাসপাতালে চিকিৎসার নামে অসহায় মানুষের সাথে সরাসরি হিংস্রতা ও জালিয়াতির ছবি প্রতিদিন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে। যাদের দেখার কথা, বিশেষভাবে মনিটরিং করার কথা, তাদের নিরবতা চিকিৎসা ব্যবস্থাকে এক টানে ‘হাবিয়া দোজখে’ অর্থাৎ সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাহান্নামের অতল তলে ঠেলে দিয়েছে।
গত দুই অক্টোবর, ২০২৬ খুলনা গেজেট পত্রিকায় চোখ বোলাচ্ছিলাম। পত্রিকাটির তৃতীয় পৃষ্ঠায় একটি খবরে চোখ আটকে গেল ‘দুর্ভোগ আর হয়রানির শেষ নেই যশোর জেনারেল হাসপাতালে!’
ওই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অসুস্থ মানুষের দুর্ভোগ ও হয়রানির যেন শেষ নেই! হাসপাতালে প্রবেশ করা থেকে চিকিৎসা পাওয়ার প্রতীক্ষায় থেকে বের হয়ে যাওয়া পর্যন্ত রোগী ও অভিভাবকদের নানা ধরনের দালাল পরিবেষ্টিত পরিবেশে চিকিৎসা নামক সেবা গ্রহণ করতে হয়। এই হাসপাতাল থেকে পুরোপুরি চিকিৎসা সেবা পেতে রোগী ও তার অভিভাবকদের সময় লেগে যায় কমপক্ষে তিন দিন!
যশোর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা অধিকাংশ রোগী এবং তাদের অভিভাবকদের স্পষ্ট অভিযোগ টিকিট কাউন্টারে দুর্ভোগ, চিকিৎসকের কক্ষে প্রবেশ করতে দুর্ভোগ, ক্যাশ কাউন্টারে দুর্ভোগ, প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে গিয়ে অন্তহীন দুর্ভোগ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার রিপোর্ট পাওয়ার সময়ও পোহাতে হয় কঠিন দুর্ভোগ। আবার সঠিক সময় রিপোর্ট না পাওয়ার কারণে অনেকে আর্থিক অসচ্ছলতার দরুন চিকিৎসককে না দেখিয়ে ‘আল্লাহ ভরসা’ করে রোগ নিয়ে কাতরাতে কাতরাতে বাড়ি ফিরে যাচ্ছেন। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস!
একটি জেলা শহরের হাসপাতালের চিত্র তুলে ধরলাম এ কারণে যে, ভাতের হাড়ির একটি ভাত টিপলে দক্ষ সংসার অভিজ্ঞ গৃহিণীরা যেমন বুঝতে পারেন, সমস্ত হাড়ির ভাত ফুটলো কিনা, আমারও উদ্দেশ্য এমন একটি ছবি চলমান সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং মাথামোটা কর্মকর্তাদের টনক নড়ানোর জন্য এতটা কথা বলে তুলে ধরা।
যশোর জেনারেল হাসপাতালে সরেজমিন পরিদর্শনে গিয়ে আমাদের জেলা প্রতিনিধি সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখতে পেয়েছেন। একেই কী বলে চিকিৎসা সেবা? চিকিৎসা নিতে আসা একাধিক রোগী এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, বহির বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহ করতে হয়। মাত্র দুটি কাউন্টার থেকে টিকিট সংগ্রহের ব্যবস্থা রয়েছে যা রোগীর চাহিদার তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল এবং বেশ হয়রানি মূলক। এর ফলে টিকিট পেতে রোগী কিংবা অভিভাবকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে অপেক্ষা করতে হয়। বলা চলে, কঠিন যুদ্ধ শেষে টিকিট নিয়ে চিকিৎসকের সামনে গিয়ে আবারও দুর্ভোগে পড়ে রোগীরা।
শ’ শ’ রোগীরা লাইন দিয়ে সিরিয়ালি থাকলেও দেখা যায় চেম্বারে চিকিৎসক নেই! নাস্তা করতে বাইরে গিয়ে এক ঘন্টায়ও ফেরেন না! চেয়ার চেম্বার খালি পড়ে রয়েছে! চিকিৎসক সহজে চেম্বারে ফেরেন না। ভাগ্যক্রমে ডাক্তার চেম্বারে থাকলেও রোগীর চিকিৎসা দানে রয়েছে চরম গাফিলতি। তারা দীর্ঘ সময় মোবাইলে নানা স্থানে কথা বলছেন অথচ রোগীরা লাইনে দাঁড়িয়ে আছে তাদের দেখার নামটিও নেই। এভাবে রোগীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকে হাসপাতালের অব্যবস্থাপনার জন্য দুর্ভোগের শিকার হন। এরপর চিকিৎসক যখন ব্যবস্থাপত্রে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্দেশনা দেন, তখন আর ক্যাশ কাউন্টারে টাকা জমা দেওয়ার সময় থাকে না। কারণ বেলা এগারোটার মধ্যে ক্যাশ কাউন্টার বন্ধ হয়ে যায়। আর টাকা জমা দিতে পারেন না রোগী কিংবা তার অভিভাবকেরা। এ কারণে দায়িত্বরত ডাক্তারদের অনেকেই সময় উতরে পরীক্ষা-নিরীক্ষার নির্দেশনা দেন, তা আবার ক্যাশ কাউন্টারে টাকা জমা দিতে গিয়ে রোগীদের লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় মোবাইলে কথা বলায় রোগী সেবা থেকে বঞ্চিত করছেন ডাক্তাররা। যে কারণে দীর্ঘ সময় লাইনে থেকে প্রায়ই রোগীদের দুর্ভোগের কবলে পড়তে হয়। এই কারণে ঐদিন ক্যাশ কাউন্টারে টাকা জমা দিতে না পারায় রোগীদের অপেক্ষা করতে হয় দিনের পর দিন।
এবার ভুক্তভোগীদের বিবরণ দেওয়া যাক। বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের মধ্যে যশোর শহরের রেল গেট এলাকার মুন্না, খড়কির পারভীনা খাতুন, মুকুল হোসেন, খোলাডাঙ্গার শিরিন আক্তার, মোক্তার আলীসহ সকল রোগীদের অভিযোগ ক্যাশ কাউন্টারে সময় বেধে দেওয়ায়, ডাক্তারদের নানা গড়িমসির কারণে হয়রানির শিকার হচ্ছে অসহায় রোগীরা। বহির্বিভাগ আন্ত : বিভাগে সর্বত্র গা ছাড়া ভাব চলছে, দেশের প্রায় সকল হাসপাতালে একই চিত্র। ডাক্তারদের ইচ্ছা মতো দায়িত্ব পালনে রোগী ও তাদের অভিভাবকরা সঠিক সময়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে পারছেন না।
আমরা এ ধরনের প্রেক্ষাপটে পরামর্শ দেবো, অভিভাবক ও রোগীদের হয়রানি মুক্ত সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে এবং গা ছাড়া ভাব কাটিয়ে উঠতে অবশ্যই ঊর্ধ্বতন মহলের তীক্ষè নজরদারি দরকার। তা কী সংশ্লিষ্ট বিভাগের স্থানীয় এবং ঊর্ধ্বতনদের হঠাৎ হঠাৎ হানা দিয়ে অবশ্যই দুর্বল মুমূর্ষু ডাক্তার নামক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার এখনই সুবর্ণ সময়। আমাদের স্পষ্ট পরামর্শ, যাদের দিয়ে কাজ হবে না, ওদেরকে ছাঁটাই দিয়ে দেওয়া ভালো।
লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
খুলনা গেজেট/এনএম

